তাকে বলা হয় রূপসী বাংলার কবি, বলা হয় নির্জনতার কবি, বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবিও বলা হয়। তবে রূপসী বাংলার কবি নামেই তিনি বেশি পরিচিত। জীবনানন্দ দাশ , যিনি কবিতায় পঙক্তিতে উঠিয়ে এনেছেন বাংলার রূপকে। বলেছিলেন উপমাই কবিত্ব। বহুমুখী উপমায় বাংলার চিরায়ত রূপকে কে আঁকতে পেরেছে তারচেয়ে বেশি?
জীবনানন্দ দাশের (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ দ্র. কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশ এর মতে কবির জন্মসাল ১৮৯৮-২২ অক্টোবর ১৯৫৪) জীবদ্দশায় মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে দেখা যায় কবির আরো বহু কবিতা অপ্রকাশিত। কবির মৃত্যুর পর আরো বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় কবির লেখা প্রবন্ধ, ছোটগল্প, উপন্যাস।
‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কবির মৃত্যুর পর। প্রকাশসময় ১৯৫৭ এর আগষ্ট। কবিভ্রাতা অশোকানন্দ দাশের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। রূপসী বাংলা’র রচনাকাল ১৯৩২। জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা’র কবিতাগুলো ছিল শিরোনামহীন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি কবিতার শিরোনাম প্রথম পঙক্তির প্রথমাংশ থেকে থেকে। ধারনা করা হয় রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের নামকরণ এবং উৎসর্গ অশোকানন্দের।
‘রূপসী বাংলা’ প্রকাশের সময় অশোকানন্দ দাশ স্বাক্ষরিত (৩১ জুলাই ১৯৫৭) ভূমিকাটি উদ্ধৃত হলো-
এই কাব্যগ্রন্থে যে কবিতাগুলি সংকলিত হল, তার সবগুলিই কবির জীবিতকালে অপ্রকাশিত ছিল; তাঁর মৃত্যুর পরে কোনো-কোনো কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতাগুলি প্রথমবারে যেমন লেখা হয়েছিল, ঠিক তেমনই পান্ডুলিপিবদ্ধ অবস্থায় রক্ষিত ছিল; সম্পূর্ণ অপরিমার্জিত। পঁচিশ বছর আগে খুব পাশাপাশি সময়ের মধ্যে একটি বিশেষ ভাবাবেগে আক্রান্ত হয়ে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল। এসব কবিতা “ধূসর পান্ডুলিপি” পর্যায়ের শেষের দিকের ফসল।
কবির কাছে ‘এরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা, স্বতন্ত্র সত্তার মতো নয় কেউ, অপরপক্ষে সার্বিক বোধে একশরীরী; গ্রামবাংলার আলুলায়িত প্রতিবেশ-পৃসৃতির মতো ব্যাস্টিগত হয়েও পরিপূরকের মতো পরস্পরনির্ভর।...
প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৫৭। প্রকাশক : সিগনেট প্রেস। আকার ডিমাই, ৮+৬২ পৃষ্ঠা। প্রচ্ছদশিল্পী : সত্যজিৎ রায়। মূল্য : তিন টাকা। উৎসর্গ : ‘আবহমান বাংলা- বাঙালী’।
সূচিপত্র- ১. সেইদিন এই মাঠ ২. তোমরা যেখানে সাধ ৩. বাংলার মুখ আমি ৪. যতদিন বেঁচে আছি ৫. একদিন জলসিড়ি ৬. আকাশে সাতটি তারা ৭. কোথাও দেখিনি, আহা ৮. হায় পাখি, একদিন ৯. জীবন অথবা মৃত্যু ১০. যেদিন সরিয়া যাব ১১. পৃথিবী রয়েছে ব্যস্ত ১২. ঘুমায়ে পড়িব আমি ১৩. ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন ১৪. যখন মৃত্যুর ঘুমে ১৫. আবার আসিব ফিরে ১৬. যদি আমি ঝরে যাই ১৭. মনে হয় একদিন ১৮. যে শালিখ ম’রে যায় ১৯. কোথাও চলিয়া যাবো ২০. তোমার বুকের থেকে ২১. গোলপাতা ছাউনীর ২২. অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয়া ২৩. ভিজে হয়ে আসে মেঘে ২৪. খুঁজে তারে মরো মিছে ২৫. পাড়াগাঁর দু’পহর ২৬. যখন সোনার রোদ ২৭. এই পৃথিবীতে এক ২৮. কত ভোরে দু’পহরে ২৯. এই ডাঙা ছেড়ে হায় ৩০. এখানে আকাশ নীল ৩১. কোথাও মাঠের কাছে ৩২. চ’লে যাব ৩৩. এখানে ঘুঘুর ডাকে ৩৪. শ্মশানের দেশে তুমি ৩৫. তবু তাহা ভুল জানি ৩৬. সোনার খাঁচার বুকে ৩৭. কত দিন সন্ধ্যার ৩৮. এ-সব কবিতা আমি ৩৯. কত দিন তুমি আর ৪০. এখানে প্রাণের স্রোত ৪১. একদিন যদি আমি ৪২. দূর পৃথিবীর গন্ধে ৪৩. অশ্বত্থ বটের পথে ৪৪. ঘাসের বুকের থেকে ৪৫. এই জল ভালো লাগে ৪৬. একদিন পৃথিবীর ৪৭. পৃথিবীর পথে আমি ৪৮. মানুষের ব্যথা আমি ৪৯. তুমি কেন বহু দূরে ৫০. আমাদের রূঢ় কথা ৫১. এই পৃথিবীতে আমি ৫২. বাতাসে ধানের শব্দ ৫৩. একদিন এই দেহ ৫৪. আজ তারা কই সব ৫৫. হৃদয়ে প্রেমের দিন ৫৬. কোনোদিন দেখিব না ৫৭. ঘাসের ভিতরে যেই ৫৮. এইসব ভালো লাগে ৫৯. সন্ধ্যা হয় ৬০. একদিন কুয়াশার ৬১. ভেবে ভেবে ব্যাথা পাব
২২ অক্টোবর ১৯৫৪, শুক্রবার, রাত ১১-৩৫। রূপসী বাংলার কবির মৃত্যু হয়। এ মৃত্যু কবির চেতনাকে নিভিয়ে দিতে পারে নি। কবিতায় কবি বারবার ফিরে আসেন জলসিড়ি নদীটির তীরে। ৫৫তম মৃত্যুদিবসে কবির প্রতি অনেক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
0 Comments