১. বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের বিবরণ দেও।
দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দুটি নদী - গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সেখানেই কালের পরিক্রমায় গড়ে ওঠা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ। এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র মোহনা অঞ্চলে প্রায় ৩০০০ বছর বা তারও পূর্ব থেকে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস, তা-ই ইতিহাসের নানান চড়াই উতরাই পেরিয়ে এসে দাড়িয়েছে বর্তমানের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ রূপে। ভৌগোলিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে। এর ভূখণ্ড ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার (বিবিএস ২০২০ অনুসারে) অথবা ১,৪৮,৪৬০ বর্গকিলোমিটার (সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক ২০২১ অনুসারে) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর, আর পূর্ব জুড়ে রয়েছে ভারত। পশ্চিমে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্য। পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম। তবে পূর্বে ভারত ছাড়াও মিয়ানমারের (বার্মা) সাথে সীমান্ত রয়েছে। দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪,২৪৬ কিলোমিটার যার ৯৪ শতাংশ (৯৪%) ভারতের সাথে এবং বাকী ৬ শতাংশ মিয়ানমারের সাথে। বাংলাদেশের তটরেখার দৈর্ঘ্য' ৫৮০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতগুলোর অন্যতম।
বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র সমতল হতে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সমুদ্র সমতল মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পেলেই এদেশের ১০% এলাকা নিমজ্জিত হবে বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের উচ্চতম স্থান দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এর মোডক পর্বত, যার উচ্চতা ১,০৫২ মিটার (৩,৪৫১ ফুট)। বঙ্গোপসাগর উপকূলে অনেকটা অংশ জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিন সহ নানা ধরনের প্রাণীর বাস। ১৯৯৭ সালে এই এলাকাকে বিলুপ্তির সম্মুখীন বলে ঘোষণা দেয়া হয়।
বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে ৬টি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে-গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। বছরে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ১৫০০-২৫০০মি.মি./৬০-১০০ইঞ্চি; পূর্ব সীমান্তে এই মাত্রা ৩৭৫০ মি.মি./১৫০ইঞ্চির বেশি। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২৫o সেলসিয়াস। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কর্কটক্রান্তি অতিক্রম করেছে। এখানকার আবহাওয়াতে নিরক্ষিয় প্রভাব দেখা যায়। নভেম্বর হতে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয়। মার্চ হতে জুন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্ম কাল চলে। জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এসময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, ঘূর্নিঝড়, টর্নেডো, ও জলোচ্ছাস প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশে আঘাত হানে।
২. “বাঙালী একটি সংকর জাতি” ব্যাখ্যা কর।
বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের মধ্যে অন্যতম একটি প্রশ্ন হচ্ছে বাঙালি জাতিকে কেন সংকর জাতি বলা হয়ে? অথবা, বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ব্যাখ্যা করো। আজকে আমরা এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আপনাদের সামনে এই দুটো প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণভাবে সহজ ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আপনার খুব সহজেই এই আর্টিকেলটি পড়ে এই বিষয়ে সকল ধরনের তথ্য পেয়ে যাবেন।
বাঙালি জাতিকে সংকর জাতি বলা হয় এর কারণ হচ্ছে একের অধিক জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ আমাদের বাঙালি জাতির মধ্যে রয়েছে। যেহেতু একাধিক জাতির সংমিশ্রণ এই জাতির মধ্যে রয়েছে সেহেতু বাঙালি জাতিকে সংকর জাতি বলা হয়ে থাকে।
আমাদের বাঙ্গালীদের মধ্যে কেউ কালো, কেউ ফর্সা, কেউ আকৃতিতে লম্বা এবং কেউবা খাটো হয়ে থাকেন। অপরদিকে জাপানি এবং চীনা নাগরিকদের মধ্যে আমরা যদি দেখি তবে তাদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য থাকে না। অর্থাৎ প্রত্যেকটা জাপানি ব্যক্তি প্রায় দেখতে একই রকমের হয়ে থাকেন। তাদের আকৃতি এবং গায়ের রং থেকে শুরু করে অনেক বিষয় একই রকমের হয়ে থাকে। কিন্তু বাঙ্গালীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন টা কেন হয়ে থাকে। বাঙালিদের মধ্যে এ ভিন্নতা দেখা যায় এর কারণ হচ্ছে বাঙালিরা একক কোন নৃগােষ্ঠী থেকে আসেনি। বাঙালিরা মিশ্র জাতিগোষ্ঠী।
প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিভিন্ন কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করতেন। নৃতাত্ত্বিকদের মতে পৃথিবীর প্রধান চারটি নৃগোষ্ঠীর কোন না কোন শাখা এসে মিলেছে এই বাংলা ভূখণ্ডে। বাংলায় আগত জনগােষ্ঠীকে সাধারণত দু'ভাগে ভাগ করা যায়।
- প্রাক আর্য বা অনার্য নৃগোষ্ঠী
- আর্য নৃগোষ্ঠী
প্রাক আর্য বা অনার্য জনগােষ্ঠী
প্রাচীনকাল থেকেই অনার্য জনগােষ্ঠী বাংলা অঞ্চলে বসবাস করে এসেছে অর্থাৎ এই জনগােষ্ঠী বাংলার আদি জনগােষ্ঠী। আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকে এদেশে বসবাসকারী জনগােষ্ঠী অনার্য নামে পরিচিত। অনার্য জনগােষ্ঠী আবার চারটি প্রধান শাখায় বিভক্ত:
- অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড
- নেগ্রিটো
- দ্রাবিড়
- মঙ্গোলয়েড
অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড
এরা অস্ট্রেলিয়ার কাছের দ্বীপসমূহ থেকে আসা আদিম অধিবাসী। ঐতিহাসিকদের মতে,অস্ট্রিকরাই এদেশের প্রাচীনতম বাসিন্দা। বর্তমানে বাঙালিদের মধ্যে এ নৃগােষ্ঠীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এদের গায়ের রং গাঢ় কালাে, মাথার গড়ন লম্বা, নাক প্রশস্ত, উচ্চতা বেটে ও মধ্যমাকার।
নেগ্রিটো
নিগ্রোদের মতাে দেহ গঠনযুক্ত এক আদিম জাতির এ দেশে বসবাসের কথা অনুমান করা হয়। এদের নেগ্রিটো বা নিগ্রোয়েড বলা হয়। এদের আদি নিবাস ছিল আফ্রিকা। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে এবং মেলানেশিয়ায় এরা বসবাস করতাে। এদের গায়ের রং কালো, আকার খর্বাকৃতি, ঠোট পুরু ও উল্টানাে, নাক খুবই চ্যাপ্টা।
দ্রাবিড়
অস্ট্রিক ধাচের তার একটি গােষ্ঠী হলো দ্রাবিড়রা। অস্ট্রেলিয় আদিম অধিবাসীদের সাথে এদের মিল রয়েছে বলে এদরকে আদি অস্ট্রেলীয় বলা হয়। এরা ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল থেকে এদেশে আসে। এদের গায়ের রং কালো থেকে বাদামি, এদের দেহ মধ্যমাকার, মাথা লম্বা,নাক চওড়া, চুল কালাে ও বাদামি এবং ঢেউ খেলানাে।
মঙ্গোলয়েড
পূর্ব এশিয়ায় মঙ্গোলীয় নরগােষ্ঠী বসবাস করে থাকে । এ জনগােষ্ঠী দক্ষিণ ও পশ্চিম চীন থেকে এদশে আগমন করে। এদের গায়ের রং পীতাভ থেকে বাদামী, আকৃতিতে বেটে, চুল কালাে ও ঋজু, মাথার আকৃতি গােল, নাক চ্যাপ্টা, চোখের পাতা সামনের দিকে ঝােলানাে। বাংলাদেশের চাকমা, গারাে,হাজং, মুরং,খাসিয়া, মগ, ত্রিপুরা, মিজো, মারমা ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃগােষ্ঠীরা এই নরগােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
আর্য জনগােষ্ঠী
আর্যরা এদেশে বহিরাগত জনগােষ্ঠী। তারা বাংলায় আগমন করে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের আগে। উত্তর ভারতের গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করে আর্যরা ক্রমে সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এদেশে আর্যরা বৈদিক সভ্যতার জন্ম দেয়। এদের লম্বা মাথা, সরু ও মাঝারি নাক, গায়ের রং ফর্সা, পুরুষদের দাড়ি গােফ বেশি।
পরবর্তীসময়ে ধর্মপ্রচার ও ব্যবসা বাণিজ্য বা দেশজয়ের জন্য এদেশে বিভিন্ন দেশের মানুষ এসেছে।এদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের আকর্ষণ করেছে বিভিন্ন দেশের মানুষদের। মধ্য এশিয়া, পারস্য, ও তুরস্ক থেকে আসা শক, তুর্কি, পাঠান, মােগল, ইরানি, আবিসিনীয়, আরব জনগােষ্ঠী এদেশে এসে বসবাস করার সুবাদে বাঙালি রক্তের সাথে তাদের সংমিশ্রণ ঘটেছে। পরে ইংরেজ, পুর্তগিজ এবং ওলন্দাজদের সাথে এই অঞ্চলের মানুষের রক্ত ধারা মিশেছে। এভাবে দেখা যায়, বাঙালি কোন বিশুদ্ধ নৃগােষ্ঠীগত জাতি নয়। বাঙালি জাতি গঠনে নানা ধরনের নরগােষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। তাই বাঙালি হচ্ছে একটি সংকর জাতি।
৩. দ্বিজাতীতত্ব কী?
দ্বিজাতি তত্ত্ব (উর্দু: دو قومی نظریہ, দেবনাগরী: दो क़ौमी नज़रिया, do qaumi nazariya) হল এমন একটি মতাদর্শ যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রাথমিকভাবে কেবলমাত্র তাদের ধর্মের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমান এবং হিন্দু দুটি স্বতন্ত্র জাতীয়তার পরিচয় দেয়া হয়েছে, এবং যেখানে ভাষা, বর্ণ এবং অন্যান্য বৈশিষ্টের তুলনায় ধর্মকে বেশি প্রধান্য দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলন এবং ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের অন্যতম কারণ ছিলো এই দ্বিজাতি তত্ত্ব।
৪. লাহর প্রস্তাবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কি?
লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাব, যাকে পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণাও বলা হয়, তা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবী জানিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবনা। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলীম লীগের অধিবেশনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের পক্ষ হতে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের প্রারম্ভিক খসড়া তৈরি করেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান যা আলোচনা ও সংশোধনের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটি সমীপে পেশ করা হয়। সাবজেক্ট কমিটি এ প্রস্তাবটিতে আমূল সংশোধন আনয়নের পর ২৩ মার্চ সাধারণ অধিবেশনে মুসলিম লীগের পক্ষ হতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক সেটি উপস্থাপন করেন এবং চৌধুরী খালিকুজ্জামান ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ তা সমর্থন করেন। মূল প্রস্তাবটি ছিল উর্দু ভাষায়। এই সম্মেলনে ফজলুল হককে "শেরে বাংলা" উপাধি দেয়া হয়।
১৯৪০ খ্রীস্টাব্দের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম দেশের দাবী জানিয়ে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে পাঞ্জাবের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান লাহোর প্রস্তাবের প্রারম্ভিক খসড়া তৈরি করেন এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবটি মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিলো লাহোর প্রস্তাবের মাঝে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়াতে এবং ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মতামত না-নিয়ে ভারত সরকারের যুদ্ধে যোগদানের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা আলোচনা করতে এবং ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহে মুসলিম লীগের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণের জন্য মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাধারণ অধিবেশন আহবান করেন।
মুসলিম লীগের কর্মীদের একটি ক্ষুদ্র দল নিয়ে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অধিবেশনে যোগদানের জন্য বাংলার মুসলিম লীগ দলের নেতৃত্ব দেন এ.কে ফজলুল হক এবং তাঁরা ২২ মার্চ লাহোরে পৌঁছেন। বাংলার প্রতিনিধি দলকে বিপুল জয়ধ্বনি দিয়ে বরণ করা হয়।
জিন্নাহ তাঁর দুঘণ্টারও অধিক সময়ব্যাপী বক্তৃতায় কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সমালোচনা করেন এবং দ্বি-জাতি তত্ত্ব ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি দাবি করার পেছনের যুক্তিসমূহ তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তিসমূহ সাধারণ মুসলিম জনতার মন জয় করে।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান লাহোর প্রস্তাবের প্রারম্ভিক খসড়া তৈরি করেন, যা আলোচনা ও সংশোধনের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটি সমীপে পেশ করা হয়। সাবজেক্ট কমিটি এ প্রস্তাবটিতে আমূল সংশোধন আনয়নের পর ২৩ মার্চ সাধারণ অধিবেশনে ফজলুল হক সেটি উত্থাপন করেন এবং চৌধুরী খালিকুজ্জামান ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ তা সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি উপস্থাপনের সময় ফজলুল হক বক্তব্য রাখেন। লাহোর প্রস্তাবটি ছিল ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব এলাকাসমূহের মতো যে সকল অঞ্চলে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে সব অঞ্চলে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (স্টেটস্) গঠন করতে হবে যার মধ্যে গঠনকারী এককগুলি হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।
বাংলার মুসলমানগণ, যারা উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে ফিরছিল, পরিশেষে লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে তার সন্ধান পায়। লাহোর প্রস্তাব তাদেরকে একটি জাতীয় চেতনা প্রদান করে। তখন থেকে মুসলিম রাজনীতির প্রধান ধ্যানধারণা হিন্দুদের অবিচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পরিবর্তে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব অর্জনের দাবির রূপ পরিগ্রহ করে।
২৪ মার্চ প্রবল উৎসাহের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রসমূহ লাহোর প্রস্তাবকে ক্যামব্রিজে বসবাসরত দেশত্যাগী ভারতীয় মুসলমান রহমত আলী কর্তৃক উদ্ভাবিত নকশা অনুযায়ী ‘পাকিস্তানের জন্য দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৪০ সালের প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তানের উল্লেখ নেই এবং ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের’ দাবি জানাতে গিয়ে লীগের মুখপাত্রগণ কি চাচ্ছেন সে সম্পর্কে মোটেও দ্ব্যর্থহীন ছিলেন না। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ মুসলিম নেতৃত্বকে একটি সুসামঞ্জস্য স্লোগান সরবরাহ করে, যা অবিলম্বে তাঁদেরকে একটি রাষ্ট্রের ধারণা জ্ঞাপন করে। মুসলমান নেতাদের পক্ষে সাধারণ মুসলিম জনগণের নিকট লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা প্রদান এবং এর প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব হৃদয়ঙ্গম করাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারত। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ কর্তৃক প্রস্তাবটিকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে নামকরণ হওয়াতে সাধারণ জনগণের মাঝে এর পূর্ণ গুরুত্ব জনে জনে প্রচার করার ব্যাপারে মুসলমান নেতৃবৃন্দের অনেক বছরের পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। পাকিস্তানের ধারণাটির প্রতি জোর দেওয়ার মাধ্যমে হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রসমূহ একজন আইনজীবীর অত্যধিক শব্দবহুল আচ্ছন্ন বর্ণনাকে উদাত্ত আহবানে পর্যবসিত করতে সাহায্য করে।
১৯৪১ সালের ১৫ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাবকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রে একটি মৌল বিষয় হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত এটি লীগের প্রধান বিষয় ছিল।
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৪০ সালের পরবর্তী সময় থেকে ভারতীয় স্বাধীনতার বিতর্কের প্রধান প্রসঙ্গ ছিল পাকিস্তান। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করতে এবং স্বশাসনকে সহজতর করার সাহায্য কল্পে ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে যখন মন্ত্রী মিশন ভারতে পৌঁছে, তখন ৭ এপ্রিল দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ তাদের ‘পাকিস্তান দাবি’র পুনরাবৃত্তি করতে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের তিন-দিনব্যাপী এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়। সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করতে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটি চৌধুরী খালিকুজ্জামান, হাসান ইস্পাহানি ও অন্যান্যদের সমবায়ে একটি উপ-কমিটি নিয়োগ করে। চৌধুরী খালিকুজ্জামান প্রস্তাবের একটি খসড়া তৈরি করেন। অন্যান্য সদস্যদের সাথে খসড়াটি নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং সামান্য পরিবর্তনের পর উপ-কমিটি এবং অতঃপর সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ‘স্টেটস’ (States) শব্দটিকে একবচন শব্দ ‘স্টেট’ (State)-এ পরিবর্তন করা হয়। এ পরিবর্তন মূল লাহোর প্রস্তাবের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করে।
১৯৪৬ সালে মুসলমান আইন প্রণয়নকারীদের দিলি সম্মেলনে যে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয় তাতে নিম্নোক্ত মূলনীতিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল:
ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে বাংলা ও আসাম সমবায়ে এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান সমবায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের নিয়ে যে অঞ্চলসমূহ গঠিত, সে অঞ্চলসমূহকে নিয়ে একটি সার্বভৌম স্বাধীন ‘রাষ্ট্র’ গঠন করা হোক এবং কোন রকম বিলম্ব ছাড়াই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার প্রদান করা হোক। কমিটি এ পরিবর্তনের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলে নি।
উন্মুক্ত অধিবেশনে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী এবং সমর্থন করেন চৌধুরী খালিকুজ্জামান। আবুল হাশিম দাবি করেন যে, আগের দিন জিন্নাহ যখন সাবজেক্ট কমিটি সমীপে এটি তোলেন তখন তিনি বৈধতার প্রশ্নে সেখানে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি অভিমত পোষণ করেন যে, খসড়া প্রস্তাবটিকে লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনের মতো মনে হচ্ছিল, যদিও এটা বলা হয়নি, অথবা এটাকে লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনের আকারে উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি এ ধরনের যুক্তি দেখিয়েছেন বলে দাবি করেন যে, লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলসমূহে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে মনশ্চক্ষে দেখা হয়েছে এবং ১৯৪১ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রস্তাবটিকে ঐ রাজনৈতিক দলটির মৌল বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনি এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন যে, মুসলিম লীগের আইন প্রণয়নকারীদের দিল্লি সম্মেলনে লাহোর প্রস্তাবের সারমর্ম পরিবর্তন করা অথবা এর আকারে রূপান্তর আনয়ন করার ব্যাপারে আইনগত বৈধতা ছিল না।
জিন্নাহ প্রথমে লাহোর প্রস্তাবের বহুবচনবাচক ‘এস’ (S)-কে ‘সুস্পষ্ট মুদ্রণ ভ্রম’ হিসেবে অভিহিত করেন কারণ মূল প্রস্তাবটি ছিল উর্দুতে। কিন্তু যখন আবুল হাশিমের অনুরোধে সভার মূল কার্যবিবরণীর রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা হয় তখন জিন্নাহ তাঁর নিজের দস্তখতের নিচে বহুবচনবাচক ‘এস’ দেখতে পান। জিন্নাহকে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ অর্জনে সহায়তা করতে গিয়ে আবুল হাশিম নিশ্চিতভাবে বলেন যে, তিনি (হাশিম) ‘ওয়ান’ শব্দটি ঘষে তুলে ফেলে তদ্স্থলে অনির্দিষ্টবাচক আর্টিকেল ‘এ’ বসানোর ইঙ্গিত দেন যাতে জিন্নাহর প্রস্তাব নিম্নোক্ত রূপ ধারণ করে:
আমাদের লক্ষ্য হলো ভারতের উত্তর-পশ্চিমে এবং বাংলা ও আসামকে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের উত্তর-পূর্বে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করা।
এটা বলা হয়ে থাকে যে, জিন্নাহ আবুল হাশিমের উদ্ভাবিত উপায় যথাযথ বলে গ্রহণ করেন। হাশিমের মতানুসারে, জিন্নাহর উপদেশে সোহরাওয়ার্দী সম্মেলনের উন্মুক্ত অধিবেশনে প্রস্তাবটিকে রূপান্তরিত আকারে পেশ করেন। সুতরাং এটা প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম আইন প্রণয়নকারীদের দিল্লি সম্মেলনের পরও জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনের পরিভাষা অনুসারে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন না। জিন্নাহ যে সাবজেক্ট কমিটির সভাপতি ছিলেন সেটিও আপাতদৃষ্টিতে যতদূর মনে হয় এ গঠনতান্ত্রিক অবস্থান নেয় যে, মুসলিম আইন প্রণয়নকারীদের সম্মেলন লাহোর প্রস্তাবের সংশোধন আনয়নের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার বৈধ বা যোগ্য স্থান নয়। অথবা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দেশের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার পর জিন্নাহও এটির সংশোধন করতে পারেন না। বাংলা থেকে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধিদলকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদানপূর্বক জিন্নাহর নিকট প্রেরণ করা হলে তাঁদের সাথে সাক্ষাতের সময় তিনি নেতৃবৃন্দকে আশ্বাস দেন যে, লাহোর প্রস্তাবটি সংশোধন করা হয়নি। ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই তারিখে জিন্নাহ তাঁর মালবারি পাহাড়ে অবস্থিত বাসভবনে বসে আবুল হাশিমকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে অভীষ্ট লক্ষ অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন।
৫. বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীর গতিপথ বর্ণনা কর।
নদীই বাংলাদেশের প্রাণ। এ দেশের বুক চিরে বয়ে গেছে প্রায় ৮০০ নদ-নদী। দেশের প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে নদীগুলো। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতির সঙ্গে এসব নদীর রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।
বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদী হলো পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মা কীর্তিনাশা নামেও পরিচিত। ৩৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীটি ভারতের গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাছ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পদ্মা চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। পদ্মার গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট এবং সর্বোচ্চ গভীরতা এক হাজার ৫৭১ ফুট। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর রাজশাহী পদ্মার উত্তর তীরে অবস্থিত। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রশস্ততম আরেকটি নদী হলো মেঘনা। ভোলার কাছাকাছি একটি জায়গায় মেঘনা ১২ কিলোমিটার প্রশস্ত। আসামের লুসাই পাহাড় থেকে উদ্ভূত মেঘনা নদী সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মেঘনার প্রধান শাখা নদীগুলোর একটি হলো ধলেশ্বরী নদী। প্রধান তিনটি নদীর মধ্যে আর একটির নাম যমুনা। এটি ব্রহ্মপুত্রের প্রধান শাখা নদী। ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনা উৎপত্তি লাভ করে। চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে যমুনা গোয়ালন্দ ঘাটের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়। যমুনাও বেশ প্রশস্ত নদী। বর্ষার সময় তীর থেকে তীরের দূরত্ব দাঁড়ায় প্রায় ৮ থেকে ১৩ কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমেও এ প্রশস্ততা ৩ কিলোমিটারের নিচে নামে না। যমুনার শাখা নদীগুলোর মধ্যে তিস্তা, ধরলা, করতোয়া ও আত্রাই অন্যতম।
0 Comments